Skip to main content

সত্যি কি শত্রুমুক্ত হয়েছিলাম?

  • সত্যি কি শত্রুমুক্ত হয়েছিলাম?
    সত্যি কি শত্রুমুক্ত হয়েছিলাম?

পঞ্চগড় জেলার বোদা হানাদার মুক্ত হয়েছিলো ১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। আমি ভারত থেকে বোদা ফিরি ৩ ডিসেম্বর। পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাটের পতিরামপুরের কাছাকাছি এক আত্মীয় বাড়িতে ছিলাম। সেখানে ভারতীয় এক সেনাকর্মকর্তার সঙ্গে আমার কেমন করে যেন বেশ ভাব হয়েছিলো। তিনি আমাকে নানা ধরনের খবর দিতেন।

নভেম্বরের শেষ দিকে তিনি আমাকে বলেন দিন কয়েকের মধ্যে আমি দেশে ফিরতে পারবো। ৩০ নভেম্বর হিলি সীমান্তে ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হলো। ওই সামরিক কর্মকর্তা বললেন, তোমার পঞ্চগড় মুক্ত। বাবা-মা কাউকে কিছু না বলে আমি ২ ডিসেম্বর বোদার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সারাদিন নানা মাধ্যমে শিলিগুড়ি পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেলো। যখন মানিকগঞ্জ সীমান্ত অতিক্রম করলাম তখন সন্ধ্যা হয় হয়। পথঘাট খুব চিনি না। তবে বোদা ফেরার তীব্র টানে হাঁটতে শুরু করলাম। শীতের সময়। সঙ্গে শীতবস্ত্র ছিলো না। তবে হাঁটার কারণে তেমন গরম লাগছিলো না। কয় ঘণ্টা হেঁটেছি, বলতে পারবো না।

এক সময় ক্লান্তিতে শরীর অবশ হয়ে আসছিলো। আর চলতি পারছিলাম না। দীর্ঘ পথে আমি একা পথিক। অবসন্ন শরীর যখন নেতিয়ে পড়ছিলো, তখনই দেখতে পেলাম কয়েকজন হাটফেরত মানুষ। তার মধ্যে একজন আমাকে চিনতে পারলেন। শুনলাম ওই জায়গার নাম মন্ডলহাট। বোদা হাটবার ছিলো সেদিন, বুধ অথবা শনিবার। যাদের দেখা পেলাম তারা বোদা হাট করে মন্ডলের হাটে ফিরছিলেন নিজের বাড়িতে। হ্যারিকানের আলো মুখে ধরে আমাকে যিনি চিনতে পারলেন, তিনি তার বাড়িতে যেতে বললেন। অনতিদূরে তার বাড়ি জেনে আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলাম। কারণ আমি আর চলতে পারছিলাম না।

কোনো রকমে পা টেনে টেনে তার বাড়ি পৌঁছে যে আতিথেয়তা পেলাম তা সারা জীবন মনে থাকবে। পানি গরম করে দিলেন হাত-পা ধোয়ার জন্য। তারপর গরম দুধ-চিড়া দিয়ে নাস্তা। অতো রাতে মুরগি জবাই দেওয়া হলো। গরম গরম রাতের খাওয়া। এরমধ্যেই নয় মাসের টুকটাক গল্প। আমি ওই ভদ্রলোকের নাম মনে করতে পারছি না। তবে তার সেদিনের কথাগুলো এখনও কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন, বাবু, আপনারা তো হিন্দুস্থানে গিয়ে আরামে ছিলেন। এখানে আমাদের কতো বিপদ।

একদিকে পাকিস্তানি মিলিটারির ভয়, অন্যদিকে মুক্তিবাহিনীর ভয়। আমার মতো যারা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা ‘আরামে’ ছিলেন বলে ভেতরে যারা ছিলেন তাদের ধারণা হয়েছিলো। এটা যে ঠিক নয়, সেটা কি আর কোনো দিন তারা বুঝতে পেরেছেন?

আমি বোদা বাজারে আসি ৩ ডিসেম্বর সকাল ১০ টার দিকে। আমিই বোদায় ফেরা প্রথম শরণার্থী। আমাদের বাড়ি ছিলো তখন সাতখামার আখক্রয় কেন্দ্রের পাশে। এখন বোদার পৌর মেয়র ওয়াহিদুজ্জামান সুজার বাড়ির সামনের দিকে ছিলো আমাদের বাড়ি। আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন ডা. শামসুদ্দিন, আমিনুল স্যার।
বাড়ি ফিরে আমার দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। বাড়িতে ঘরদুয়ার কিছু ছিলো না। টিনের ঘর ছিলো আমাদের। সব কিছু লুট করে খালি ভিটা ফেলে রেখেছিলো।

আমি তাহলে থাকবো কোথায়? গিয়ে উঠলাম সিরাজউদ্দিন সরকারের বাসায়। তার নাতি আবু ইলিয়াস প্রধান আমার বন্ধু। ইলিয়াস এখন আলাদা বাড়ি করেছে পাশেই। ও ডাক্তার। সরকারি চাকরিতে অবসর নিয়ে বোদায় একটি ক্লিনিক দিয়েছে। ইলিয়াসের সঙ্গে সম্ভবত এক মাসের বেশি সময় ছিলাম। ওর বিছানায় শুয়ে শুয়েই ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমপর্ণের খবর রেডিওতে শুনেছিলাম।

হানাদারমুক্ত বোদায় এসে আমি কী দেখেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস কার কী ভূমিকা ছিলো , আমাদের বাড়ির জিনিসপত্র কে বা কারা লুট করেছিলো, আমার পড়ার টেবিল কার বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছিলাম, সেসব আর বলতে চাই না।

দেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে, আবার দেশে ফিরতে পেরেছি সেই আনন্দের চেয়ে অন্য কষ্টের বিষয়গুলো আমার কাছে তখন তুচ্ছ ছিলো, এখনও আছে।

মানুষের পক্ষ বদল, রূপ বদল আমি কাছ থেকে দেখেছি। মানুষের বিদ্বিষ্ট মনোভাবের পাশাপাশি উদারতাও দেখেছি।

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য উচ্ছ্বাস-উল্লাসের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান ভাঙার নীরব মনোবেদনাও কারো কারো মধ্যে লক্ষ করেছি।

তখনই আমার মনে প্রশ্ন ছিলো, আমরা বাইরের শত্রুদের পরাজিত করলাম, কিন্তু আমাদের দেশীয় শত্রুরা কী পরাজিত হলো?

আজও আমি সেই প্রশ্ন নিয়েই আছি।
বোদায় স্বাধীনতার জন্য জীবনদানকারী শহীদদের প্রতি জানাই শ্রদ্ধা।