Skip to main content

নিম্ন আয়ের মানুষের চাল-আটা বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে

  •  নিম্ন আয়ের মানুষের চাল-আটা বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে
    নিম্ন আয়ের মানুষের চাল-আটা বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে

স্বল্প আয়ের মানুষের সরকারি চাল ও আটা খোলাবাজারে (ওএমএস) বিক্রি না করে তা কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন কিছু সরবরাহকারীরা (ডিলাররা)। ২৮ টাকার চাল ৩৩ টাকায়, ১৬ টাকার আটা ১৯ টাকায় ঢাকার মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটসহ অন্যান্য বাজারে বিক্রি করেছেন ডিলাররা।

ডিলাররা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, যেগুলোকে ওএমএসের চাল বলা হচ্ছে, তা মূলত পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি বাহিনীর রেশনের পণ্য।

সরেজমিনে ঘুরে, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে, অভিযানে আটক পণ্যের বস্তার গায়ে সাঁটানো লোগো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে ওএমএসের চালই কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ওএমএসের চাল ও আটা স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে বিক্রি না করে অসাধু ডিলাররা যে কালোবাজারে বিক্রি করেছেন, এমন অভিযোগ তাঁরাও পেয়েছেন। ঢাকায় ওএমএসের চাল বিক্রয় কেন্দ্র কমানো হবে। খাদ্য সংরক্ষণাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল জানিয়ে আরিফুর রহমান বলেন, সব অনিয়ম দূর করা হবে।

সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ সরকারি চাল, গম ও আটা খাদ্য সংরক্ষণাগার থেকে পাচার ও চালের দোকানে বিক্রির সময় আটক করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। সংস্থাটি বলছে, ঢাকার তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারের (সিএসডি) কিছু কর্মকর্তা, ডিলার আর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা মিলে ওএমএসের চাল ও আটা কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের কয়েকজন দোকানদার প্রথম আলোকে বলেন, অনেক আগে থেকে ডিলাররা ওএমএসের চাল ও আটা এই বাজারে এনে বিক্রি করছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্রাকে করে বা নির্ধারিত স্থানে ওএমএসের চাল ৩০ টাকায় ও আটা ১৮ টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু ডিলাররা কালোবাজারে বিক্রি করলে প্রতি কেজি চালে অতিরিক্ত ৩ টাকা ও আটায় ১ টাকা লাভ পান। তা ছাড়া বিক্রির জন্য ডিলারদের শ্রমিকও রাখতে হয় না, সারা দিনের জন্য ট্রাকের ভাড়া দিতে হয় না। ফলে ডিলাররা বেশি লাভ করতে পারেন। অন্যদিকে যে দোকানদার বা ব্যবসায়ী এসব চাল ও টাকা কেনেন, তাঁরা চাল ৩৯-৪০ টাকা আর আটা ২২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। অবশ্য মোটা চালের বাজারদর অনুযায়ী এই চালের দাম অনেক সময় কিছুটা বেশিও হয়।

সম্প্রতি এ ধরনের কয়েকটি অভিযান পরিচালনাকারী র‍্যাবের নির্বাহী হাকিম সারওয়ার আলম বুধবার প্রথম আলোকে বলেছেন, র‍্যাব সরকারি ওএমএসের চাল ও আটা জব্দ করেছে। এর প্রমাণ আছে। সরকারি এসব খাদ্যশস্য জব্দ করে তার তালিকা ঢাকার আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমানও প্রথম আলোকে বলেন, জব্দ করা চাল-আটার মালিক কে, তাঁর বিচার করবেন আদালত।

খাদ্যগুদামের চারজন পরিদর্শক, ২ জন নিরাপত্তারক্ষী, ৪ জন শ্রমিকনেতা, ২ জন ডিলারের, ১১ জন চাল ও আটা ব্যবসায়ী চক্র সরকারি খাদ্যশস্য পাচার করেছে এমন অভিযোগে র‍্যাব ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ২৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করে। জব্দ করা হয় ১৮২ টন ওএমএসের চাল, আটা ও গম।

এর মধ্যে খাদ্যগুদামের ৬ জন, ৪ শ্রমিকনেতা ও ১ জন ডিলারসহ মোট ১১ জন উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। আর পলাতক আছেন ১২ জন, তাঁদের ১১ জন দোকানদার ও একজন ডিলার। যদিও পলাতক ব্যক্তিরা প্রায় প্রতিদিনই দিনের কোনো না কোনো সময় মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে নিজ নিজ দোকানে আসছেন। গত মঙ্গলবার সরেজমিনে এসব দোকান পরিদর্শন করে এবং দোকানের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব সরকার বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি খাদ্যশস্য পাচার ও বিক্রির অভিযোগে যেসব আসামি পলাতক আছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে।

তদন্তের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পরিদর্শক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আসামিদের কাউকে তিনি ধরতে পারেননি। ফলে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ পাননি। তবে কীভাবে, কারা, কবে থেকে খাদ্য সংরক্ষণাগার থেকে খাদ্যশস্য পাচার করেছেন, তা অনুসন্ধান করছেন। সরকারি ওএমএসের মাল কীভাবে কালোবাজারে যায়, তা–ও তদন্ত করা হচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ওএমএসের অনিয়ম-জালিয়াতির সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে চালের ব্যবসা করেন নজরুল ইসলাম (৫০)। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম বন্ধু রাইস এজেন্সি। ১৬ দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর নজরুলের দোকান থেকে ২৫ টন সরকারি চাল (ওএমএসের চাল) জব্দ করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। তাঁর নামে মামলা হয়। অথচ নজরুল প্রতিদিনই দোকানে আসছেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নজরুলের দোকানে গেলে সেখানকার কর্মচারী মো. ফিরোজ প্রথম আলোকে বলেন, ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে তেজগাঁও খাদ্য সংরক্ষণাগার থেকে ট্রাকে করে চাল আসে। ট্রাক থেকে তিনিসহ অন্যরা তা নামান। র‍্যাব সেই চাল তাঁর সামনে থেকে জব্দ করে। তিনি বলেন, মালিক দোকানে আসেন, বসেনও। এ দোকান থেকে মালামাল জব্দ করার সময় উপস্থিত ছিলেন বাবুল আলম, তিনি রশিদ ট্রেডিংয়ের একজন কর্মচারী। তিনি র‍্যাবের মামলার একজন সাক্ষীও। বাবুল প্রথম আলোকে বলেন, র‍্যাব এ দোকান থেকে যে চালের বস্তা জব্দ করে, তার গায়ে লেখা ছিল খাদ্য অধিদপ্তর, সুলভমূল্যে বিক্রয়ের জন্য।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের কর্ণফুলী রাইস এজেন্সি থেকে ওএমএসের চাল পাওয়া যায় ৪২৫০ কেজি। এ দোকানের ব্যবস্থাপক আবদুল কাদির প্রথম আলোকে বলেন, দোকানের মালিক গোলাম কিবরিয়া রোজই দোকানে আসেন। কিবরিয়া মামলার পলাতক আসামি।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের রহমানিয়া রাইস এজেন্সি থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের চাল পাওয়া যায় ২ টন। আর জননী এন্টারপ্রাইজ থেকে ৪ টন আটা পাওয়া যায়। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক শাহ আলম। তাঁর ভাই মোতাহার প্রথম আলোকে বলেন, ওএমএসের আটা কিনে তাঁর ভাই ভুল করেছেন। সরকারি আটা তাঁরা কেনেন ১৯ টাকায়। সুগন্ধা এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী মোস্তফা বলেন, সরকারি আটা কিনে তাঁরাও ফেঁসে গেছেন।

কৃষি মার্কেটের সোহেল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক আজিজুল হক ও মহানগর রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক আজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আগে থেকে বিভিন্ন ডিলাররা মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে ওএমএসের চাল ও আটা বিক্রি করে আসছেন।

ঢাকা মহানগর ওএমএস ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আলমগীর সৈকত। তিনি খাদ্যগুদাম থেকে আটা বের করে নেওয়ার মামলার আসামিও। তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, নিয়ম মেনেই বেশির ভাগ ডিলার চাল-আটা বিক্রি করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু ডিলার খোলাবাজারে সরকারি চাল-আটা বিক্রি করে থাকতে পারেন। 

সৈকত এখন জামিনে আছেন।

প্রধান খাদ্য সংরক্ষণাগারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

৮ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারের সামনে থেকে সাতটি ট্রাকে ৭০ টন সরকারি আটা জব্দ করে র‍্যাব। ট্রাকগুলো ঢোকার কিংবা বের হয়ে যাওয়ার কোনো তথ্য প্রতিষ্ঠানটির খাতায় উল্লেখ নেই। খাদ্য সংরক্ষণাগারে (সিএসডি) সিসি ক্যামেরাও নেই। অথচ এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই এলাকা) হিসেবে বিবেচিত। এখানে সরকারি খাদ্যশস্য মজুত রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী বিকেল ৫টার পর খাদ্যশস্য গুদাম থেকে বের করা যাবে না। গুদামের কর্মচারীরাই জানালেন, আগে এর কোনোটিই মানা হতো না। জব্দ করা ট্রাকের চালক শাহিন আলম ও আবদুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার পর গুদাম থেকে ট্রাকে করে গম নিয়ে বের হন তাঁরা।

 সরকারি আটা জব্দ করে র‍্যাব সরকারি আটা জব্দ করে র‍্যাবর‍্যাবের বিচারিক হাকিম সারওয়ার বলেন, কেপিআইভুক্ত এলাকা হিসেবে খাদ্য সংরক্ষণাগারে ট্রাক ঢোকা ও বের হওয়ার সময় অবশ্যই গাড়ির নম্বর প্রতিষ্ঠানের নিববন্ধন খাতায় লিখতে হবে। অথচ যে ট্রাকে করে চাল ও আটা পাচার করা হচ্ছিল, তার কোনো হিসাব নেই।
বিষয়টি প্রথম আলোর কাছে স্বীকারও করেন মামলার আসামি খাদ্য সংরক্ষণাগারের প্রধান নিরাপত্তারক্ষী মো. হারেজ। তিনি মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন যে ট্রাক র‍্যাব জব্দ করেছে, তা খাতায় লেখা হয়নি।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে সরকারি এই খাদ্য সংরক্ষণাগারে বেসরকারি খাদ্যশস্য রাখা হতো। কত টন চাল, কত টন আটা এখানে রাখা হয়েছে, তার কোনো হিসাবও রাখা হতো না। বেসরকারি ব্যবসায়ীরাই তাঁদের মতো করে হিসাব রাখতেন।

খাদ্য সংরক্ষণাগারের ব্যবস্থাপক একরামুল হক ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি আছে, তারা এখানে মাল রাখে।

সোমবার সন্ধ্যায় তেজগাঁওয়ের ওএমএস ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আলমগীর সৈকতের কার্যালয়ে গেলে সেখানে পাওয়া যায় আরও ছয়জন ডিলারকে। তাঁরা বলেন, ওএমএসের চাল ও আটা বেচে লাভ কম।

অবশ্য র‍্যাব বলছে, ওএমএসের চাল ও আটা কিনে কমিশন বাবদ প্রতিদিন একজন ডিলার লাভ করেন ৬ হাজার টাকা। বেশি লাভের আশায় ২৮ টাকার চাল কালোবাজারে বিক্রি করেন ৩৩ টাকা আর ১৬ টাকার আটা বিক্রি করেন ১৯ টাকা।