Skip to main content

দরিদ্রতম জেলায় উন্নয়ন-কনসার্টের পরিহাস!

  • সারা দেশে যখন দারিদ্র্য কমেছে ৭ শতাংশ, তখন কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য বেড়েছে ৭ শতাংশ। এই জেলার ৭১ শতাংশ মানুষই গরিব। এই বাস্তবতায় কুড়িগ্রাম জেলায় উন্নয়ন–কনসার্ট হওয়াটা কতখানি শোভনীয়?
    সারা দেশে যখন দারিদ্র্য কমেছে ৭ শতাংশ, তখন কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য বেড়েছে ৭ শতাংশ। এই জেলার ৭১ শতাংশ মানুষই গরিব। এই বাস্তবতায় কুড়িগ্রাম জেলায় উন্নয়ন–কনসার্ট হওয়াটা কতখানি শোভনীয়?

ধরুন, পাঁচ বন্ধু একসঙ্গে সব সময় চলাফেরা করেন। এঁদের মধ্যে একটি পরীক্ষায় চারজন উত্তীর্ণ হলেন। একজন হতে পারলেন না। যাঁরা উত্তীর্ণ হলেন, তাঁদের সবার বাড়িতে উৎসবের আয়োজন করা হলো। এমনকি বাকি চারজন মিলে একদিন উৎসবের আয়োজন হলো ফেল করা বন্ধুর বাড়িতেও। বিষয়টি যে ওই বন্ধুর জন্য অপমানের, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রামে উন্নয়ন-কনসার্টের আয়োজন অনেকটাই তদ্রূপ।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে এবং হচ্ছে। দেশের এই উন্নয়ন সর্বত্র সমানভাবে হয়নি। শুধু তা–ই নয়, কুড়িগ্রাম জেলায় উন্নয়নের হার কমেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনকে সত্য বিবেচনা করলে সারা দেশে যখন দারিদ্র্য কমেছে ৭ শতাংশ, তখন কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য বেড়েছে ৭ শতাংশ। এই জেলার ৭১ শতাংশ মানুষই গরিব। এই বাস্তবতায় কুড়িগ্রাম জেলায় উন্নয়ন–কনসার্ট হওয়াটা কতখানি শোভনীয়?

যাঁরা দলকানা, তাঁদের কাছে এর মূল্য অপরিসীম। যাঁরা দলকে ভাঙিয়ে ব্যক্তিগত অর্থবিত্তের বলয় বানাতে পেরেছেন, তাঁদের কাছেও কনসার্ট হওয়াটা জরুরি। যাঁরা উন্নয়ন এবং উন্নয়নবৈষম্য বোঝেন না, তাঁদের কাছে এই কনসার্ট প্রাসঙ্গিক। কিন্তু যাঁরা অনুভব করতে শিখেছেন যে বৈষম্যের তলানিতে পড়ে থাকা জেলা কুড়িগ্রামের কোনো অভিভাবক নেই, তাঁদের কাছে এ কনসার্ট চরম অপমানের।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামের উন্নয়ন চান। কুড়িগ্রামের জনসভায় তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এসব কাজ করার জন্য এ অঞ্চলে যোগ্য নেতৃত্বের চরম অভাব। বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল শেষ হলো, তবুও প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হলো না, চিলমারীর বন্দর চালুর ঘোষণার বাস্তবায়নও দূরবর্তী, অর্থনৈতিক অঞ্চলের কোনো কাজই হলো না। ঢাকাগামী ট্রেনও নেই। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বন্যায় উদ্বাস্তু হচ্ছে, তাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা নেই। গত বছর বন্যায় যে সেতু ভেঙেছে, তা এখনো ভাঙাই আছে। গত বছর বন্যায় যে রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটিও অনুরূপ দশায় পড়ে আছে।

যাঁরা কুড়িগ্রামে উন্নয়ন-কনসার্ট শুনে স্বস্তির ঢেকুর তুলতে চান, তাঁদের সারা দেশ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি। তাহলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অপরাপর জেলাগুলোর কী উন্নয়ন হয়েছে, আর কুড়িগ্রামের উন্নয়ন কোন তলানিতে পড়ে আছে, তা বুঝতে পারবেন। কুড়িগ্রাম হঠাৎ করে গরিব জেলার তালিকাভুক্ত হয়েছে তা নয়। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ সব সরকারের সময় এ জেলা দেশের সবচেয়ে গরিবই থেকেছে। এ জেলার কপালে যেন দারিদ্র্যের কলঙ্কতিলক স্থায়ীভাবে লিখিত হয়েছে।

মঙ্গা নেই। তিন বেলা কেন, এক বেলাও এখন আর কেউ না খেয়ে থাকে না। কুড়িগ্রামের জন্য এই উন্নয়ন দেখে থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশ মধ্যম আয়ের দিকে যখন হাঁটছে, তখন কুড়িগ্রামের মানুষের তিনবেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলেই হবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। সব সময় কুড়িগ্রাম গরিব জেলা—এ কথা আর কুড়িগ্রামের মানুষ শুনতে চান না।

কুড়িগ্রাম জেলার মানুষ প্রতিবছর জাতীয় পার্টির মানুষকে নির্বাচিত করে। জাতীয় পার্টি থেকে যাঁরা নির্বাচিত হচ্ছেন, তাঁরা ব্যবসায়ী। সাংসদ পদটি ওই সব সাংসদের বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হলে এ বছর লাঙ্গল প্রতীকের নির্বাচিত হওয়া কঠিন।

এখন জাতীয় পার্টি সওয়ার হয়েছে আওয়ামী লীগের ওপর। অথবা আওয়ামী লীগ সওয়ার হয়েছে জাতীয় পার্টির ওপর। যখন এককভাবে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় ছিল, তখনো জাতীয় পার্টি কুড়িগ্রামের জন্য বিশেষ কিছু করেনি। তখন জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের স্বৈরাচারীর দল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যদিও এরশাদের শাসন–পরবর্তী অন্য দলগুলোর নেতিবাচক অনেক কার্যক্রম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরতন্ত্রকে ছাড়িয়ে গেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সেই জাতীয় পার্টি কুড়িগ্রামের জন্য উন্নয়ন বয়ে আনবে, সেই আশা এখন দুরাশা।

আরেকটি কথা আমরা আমলে নিতে ভুলে যাই। সাংসদ যেখানে বিরোধী দলের কিংবা কম প্রভাবশালী হন, সেখানকার জনগণ কি ভ্যাট-ট্যাক্স কম দেন? দেশ স্বাধীন করায় কি তাদের অবদান কম ছিল? তারা কি দেশের মধ্যে সমান উন্নয়নের দাবিদার নন? প্রধানমন্ত্রী তো আমাদের সবার প্রধানমন্ত্রী। তাহলে কুড়িগ্রামের উন্নয়নের জন্য প্রভাবশালী লোক নেই বলে কি এমন একজন মন্ত্রীও দেশে নেই, যিনি বলতে পারেন, কুড়িগ্রামের কপাল থেকে দীর্ঘদিনের কলঙ্ক দূর করার জন্য আমরা যা করতে হয় তা–ই করব। অথচ সংবিধানে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার কথাই বলা হয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ জেলা শুধু সবচেয়ে গরিব জেলা হিসেবেই থেকেছে। আমরা যখন ছোট, তখন ভাবতাম, বিশ্বে খুব গরিব একটি দেশের নাম বাংলাদেশ। আবার এই দেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রাম। এখানে কত হতভাগাই না জন্মায়। এখন দেশ বিশ্বের আর সেই গরিব দেশটি নেই। কিন্তু এখনো কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে গরিব জেলা। ভাবতেই তো অবাক লাগে, একটি গরিব জেলার গরিবানা হাল পরিবর্তনে কোনো সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। উন্নয়নবৈষম্য দূর করার জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আজ অবধি কুড়িগ্রামের উন্নয়নবৈষম্য দূর হলো না।

উন্নয়নে বৈষম্য থাকলেও উন্নয়ন-কনসার্টে কোনো বৈষম্য হয়নি। সারা দেশের মতো কুড়িগ্রামেও ভিনদেশি সংস্কৃতির আদলে কনসার্ট হয়েছে। কুড়িগ্রামে একটি কনসার্টের আয়োজন সরকার করবে, সেটা আশার কথা। পেটের ক্ষুধা দূর হয়েছে। সুস্থ ধারার সংগীত-নাটক-নৃত্য পরিবেশিত হওয়ারও প্রয়োজন আছে। সব সময় উন্নয়ন-অনুন্নয়নের সঙ্গে সাংস্কৃতিক উৎসব সম্পর্কিত নয়। তবে যেখানে উন্নয়নবৈষম্য চরমে, সে রকম একটি জেলায় উন্নয়ন-কনসার্ট শব্দ যেন বড় বেমানান। কুড়িগ্রাম একটি দুঃখিনী জেলা। এই জেলার দুঃখ আর কলঙ্কতিলক দূর হোক, তারপর এখানেও হোক উন্নয়ন-সাংস্কৃতিক উৎসব। আমাদের জন্মজেলা, মাতৃজেলা কুড়িগ্রাম এখনো দুঃখিনী থেকে গেল। তবু আশা ছাড়িনি। মাহমুদুজ্জামান বাবুর কণ্ঠে গান, ‘ভোর হয়নি, আজ হলো না কাল হবে কি না, তাও জানা নেই। পরশু ভোর ঠিক আসবেই এ আশাবাদ তুমি ভুলো না।’

তুহিন ওয়াদুদ: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক এবং রিভারাইন পিপলের পরিচালক।
[email protected]